Nav-logo

২০১৫ সালের ছিটমহল বিনিময় ও চিলাহাটি হলদিবাড়ি সীমান্ত

Md Masum Ahmed

Md Masum Ahmed

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:৪৩ পিএম

২০১৫ সালের ছিটমহল বিনিময় ও চিলাহাটি হলদিবাড়ি সীমান্ত

২০১৫ সালের ছিটমহল বিনিময়ের সময় চিলাহাটি–হলদিবাড়ি সীমান্ত কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, সেই ইতিহাস।

২০১৫ সালের ছিটমহল বিনিময় বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মূল ভূখণ্ডের ভেতরে বিচ্ছিন্নভাবে থাকা ছিটমহলগুলোর বাসিন্দাদের নাগরিক পরিচয়, প্রশাসনিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সেবা নিশ্চিত করার পথ এই চুক্তির মাধ্যমে তৈরি হয়। এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে নীলফামারীর চিলাহাটিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল চিলাহাটি–হলদিবাড়ি সীমান্তপথের মাধ্যমে।

ছিটমহল কী ছিল?

ছিটমহল ছিল একটি দেশের এমন ভূখণ্ড, যা অন্য দেশের মূল ভূখণ্ডের ভেতরে বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করত। ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরে এমন বহু বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড ছিল। এসব এলাকার বাসিন্দারা তাদের নিজ দেশের প্রশাসন থেকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, আইনগত পরিচয় ও অন্যান্য নাগরিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতেন।

১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ–ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তি এবং ২০১১ সালের প্রোটোকলের মাধ্যমে এই দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানের কাঠামো তৈরি হয়। পরে ২০১৫ সালে চুক্তি বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়।

২০১৫ সালের ছিটমহল বিনিময়

২০১৫ সালের চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল বাংলাদেশের অংশে পরিণত হয়। এগুলোর মোট আয়তন ছিল প্রায় ১৭,১৬০.৬৩ একর। অন্যদিকে ভারতের ভেতরে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল, মোট প্রায় ৭,১১০.০২ একর, ভারতের অংশে পরিণত হয়।

ছিটমহলগুলোর প্রশাসনিক অবস্থান পরিবর্তনের পাশাপাশি সেখানে বসবাসকারী মানুষদের নাগরিকত্বের বিষয়টিও সমাধানের আওতায় আসে। বাসিন্দাদের নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী নাগরিকত্ব গ্রহণ ও প্রয়োজন হলে অন্য দেশে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

নীলফামারীর চারটি ছিটমহল

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের মধ্যে চারটি ছিল নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলায়। এগুলো হলো—

  • জে.এল. ২৮ নম্বর বড় খানকিবাড়ি
  • জে.এল. ২৯ নম্বর বড় খানকি খারিজা গিদালদহ
  • জে.এল. ৩০ নম্বর বড় খানকি খারিজা গিদালদহ
  • জে.এল. ৩১ নম্বর নগর জিগাবাড়ি

২০১৫ সালে এই চারটি ছিটমহলের বাসিন্দারা বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার সুযোগ পান। তৎকালীন প্রতিবেদনে দেখা যায়, নীলফামারীর এই চার ছিটমহলের বাসিন্দাদের মধ্যে কেউ ভারতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেননি।

অর্থাৎ, চিলাহাটি নিজে ছিটমহল ছিল না এবং চিলাহাটি এলাকার কোনো ভূখণ্ড ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে ভারতের অংশ বা বাংলাদেশের অংশ হয়নি। চিলাহাটির সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক মূলত সীমান্ত যোগাযোগ ও স্থানান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

চিলাহাটি–হলদিবাড়ি সীমান্তের ভূমিকা

২০১৫ সালের ছিটমহল বিনিময়ের সময় চিলাহাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল চিলাহাটি–হলদিবাড়ি সীমান্তপথ।

দুই দেশের মধ্যে যেসব ছিটমহলবাসী নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাদের যাতায়াতের জন্য নির্দিষ্ট সীমান্ত প্রবেশপথ নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশের চিলাহাটি এবং ভারতের হলদিবাড়ি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ছিটমহল থেকে ভারতে যাওয়া ব্যক্তিদের জন্য হালদিবাড়ি–চিলাহাটি রুট নির্ধারিত ছিল।

এই কারণে ২০১৫ সালে চিলাহাটি–হলদিবাড়ি সীমান্ত শুধু দুই দেশের সাধারণ সীমান্তপথ ছিল না; ছিটমহল বিনিময়ের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াতেও এটি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

ছিটমহলবাসীদের যাতায়াতে চিলাহাটি

২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে ছিটমহলবাসীদের একটি দল চিলাহাটি–হলদিবাড়ি সীমান্ত দিয়ে ভারতে যায়। The Daily Star-এর ২৬ নভেম্বর ২০১৫-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, পঞ্চগড়ের সাবেক ভারতীয় ছিটমহল দইখাটা ও দহলা খাগড়াবাড়ির ১০৫ জন চিলাহাটি–হলদিবাড়ি সীমান্ত চেকপোস্ট দিয়ে ভারতে যাওয়ার জন্য যাত্রা করেন।

এর কয়েক দিন পর, ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর, পঞ্চগড়ের আরও একটি দল একই চিলাহাটি–হলদিবাড়ি সীমান্ত চেকপোস্ট দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। ওই প্রতিবেদনে ১২টি পরিবারের ৩৪ জনের ভারতে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

এ ঘটনাগুলো চিলাহাটির সীমান্ত ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ছিটমহল বিনিময়ের ফলে যেসব মানুষ নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাদের একটি অংশের জন্য চিলাহাটি–হলদিবাড়ি ছিল বাস্তব যাতায়াতের পথ।

৩১ জুলাই ২০১৫: দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান

২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতের পর ছিটমহলগুলোর প্রশাসনিক অবস্থান পরিবর্তনের কার্যক্রম কার্যকর হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ভারতীয় ছিটমহলগুলো বাংলাদেশের অংশে পরিণত হয় এবং ভারতের অভ্যন্তরে থাকা বাংলাদেশি ছিটমহলগুলো ভারতের অংশে পরিণত হয়।

এর ফলে প্রায় সাত দশক ধরে চলা একটি জটিল সীমান্ত সমস্যার বড় অংশের প্রশাসনিক সমাধান হয়। ছিটমহলের বাসিন্দারা রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও নাগরিক অধিকার পাওয়ার নতুন সুযোগ লাভ করেন।

চিলাহাটির ইতিহাসে ২০১৫ সালের গুরুত্ব

চিলাহাটির ইতিহাসে ২০১৫ সালের ছিটমহল বিনিময়কে দেখতে হবে সীমান্ত যোগাযোগ ও মানবিক স্থানান্তরের ইতিহাস হিসেবে।

চিলাহাটি কোনো ছিটমহল ছিল না। কিন্তু চিলাহাটি–হলদিবাড়ি সীমান্তপথ ছিটমহল বিনিময়ের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হওয়ায় এই ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে চিলাহাটির সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয়।

বিশেষ করে ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে পঞ্চগড়ের সাবেক ছিটমহলবাসীদের কয়েকটি দল চিলাহাটি–হলদিবাড়ি সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, ছিটমহল বিনিময়ের শেষ পর্যায়ের মানবিক স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় চিলাহাটির সীমান্তপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

আপনার কাছে কি চিলাহাটির কোনো তথ্য আছে?

আপনার কাছে থাকা পুরোনো ছবি, দলিল, গল্প বা স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হোন।